অপেক্ষার শেষে – ভালোবাসার গল্প – Bangla Love Story

অপেক্ষার শেষে– দেবশ্রী
         চিঠিটা হাতে পেয়েই সকাল থেকে বড্ড অন্যমনস্ক হয়ে পরছি| ইতিমধ্যে সাত আটবার পড়া হয়ে গেছে| রাত তখন এগারোটা, পুরনো ডাইরিটা আজ খুলে বসেছি| কতো রঙ্গিন দিনের কথা লেখা সেখানে | কতো আনন্দের দিন এসেছিল জীবনে,আবার সব কোথায় যেন মিলিয়েও গেছে| এখন সব কিছু ভুলে দিব্বি কেটে যাচ্ছে দিন| সামনে আর একটা মাস বাকি পূজোর, কিন্তু এখন আর তাতে টান হয় না| 

সবার জীবনে পূজো যে আনন্দ নিয়ে আসে তা নয়| পূজোর কয়েকদিন অনেকেরই চোখে জল থাকে লুকানো| মনে কষ্ট থাকে যা দেখা যায় না | আমার জীবনটাও তেমনই একটা জীবন | এখন আমি শহরের একটি স্কুলের দিদিমণি,নতুন পরিচয়,নতুন ঠিকানা কিন্তু সাত বছর আগে জীবনটা একদম অন্য রকম ছিলো| সোনাপুর নামে একটা ছোট গ্রামে আমি বাবাকে নিয়ে থাকতাম | বাবা ছিলেন গ্রামের মাষ্টারমশাই |তাই আমাকে সবাই চিনতো আর ভালোও বাসতো|         

গ্রামে দুইতলা বাড়ি,কয়েক বিঘা জমি ,বাবার সংস্কার এই ছিল আমার জীবন| মাকে তেমন মনে পরে না| তখন অনেক ছোট মা পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়| বাবাই সব | পূজোর সময় সোনাপুর গ্রামে চৌধুরী বাড়ির পূজো হয় বেশ বড়ো করে | দূর্গাপূজো বলতে চৌধুরীদের পূজোর গন্ধ ছড়িয়ে পরতো গ্রামে| চৌধুরীরা পাঁচ ভাই পালা করে পূজোর দায়িত্ব পরতো সবার| যে যেখানেই থাকুক না কেন পূজোর কয়টা দিন গ্রামের বাড়ীতে সবাই আসতো| শোনা যায় এ পূজো দেড়শোবছর ধরে চলে আসছে| 

অপেক্ষার শেষে – ভালোবাসার গল্প – Bangla Love Story         

বাবা গ্রামের মাষ্টার মশাই তাই আমাদের প্রতি আতিথেয়তার কোন ত্রুটি হতো না| পাঁচটা দিন চৌধুরী বাড়িতেই খাওয়া দাওয়া থাকার ব্যবস্হা থাকতো| আমি  অবাক নয়নে চেয়ে থেকে প্রতিমা বানানো থেকে শুরু করে বিসর্জন পর্যন্ত সব দেখতাম| ছোট থেকে বড়ো হয়ে ওঠা ঐ পূজো দেখেই| তখন আমার বয়সি সব ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের সাথে আমি খেলায় ব্যস্ত| এই কটাদিন কি ভাবে যে কেটে যেত সে নিজেও বুঝতে পারতাম না|              

চৌধুরী বাড়িতে আর একজনও আসতো এ সময়ে কমলা কাকিমার ছেলে| কমলা কাকিমা চৌধুরী বাড়ীর মেজবৌ| আমেদাবাদে থাকেন তারা| একটি মাত্র ছেলে অভীক| ছোট থেকেই ওর সাথে পূজোর কয়দিন বেশ আনন্দ করে খেলতাম| কানামাছি,লুকোচুরি | আনেক বন্ধুদের মধ্যে ও ছিল আমার খুব পছন্দের| কিছু বলার আগেই ও আমার মনের কথা সব বুঝতে পারতো| আমার ওপর অভীকের একটা অধিকার ছিল যা না বললেও আমি বুঝতে পারতাম|এই অধিকার দেখানোর মানুষ খুব বেশি ছিলনা আমার জীবনে তাই হয়তো আমিও তা উপভোগ করতাম| কমলা কাকীমাও আমাকে খুব পছন্দ করতেন ঠিক যেন মায়ের মতন| মাকে পাইনি তাই একটা দিন তার থেকেই যতোটা আদায় করে নেওয়া যায়| তা দেখে অভীকের খুব হিংসা হতো| 

Bangla Sad Love Story

……..কিন্তু এলি কেন?…….কারন আমি তোমায় ভালোবাসি| আমি তোমার ভালো চাই| আর সব কথা সবসময় বলা যায় না| বুঝে নিতে হয়|       এই বলে আমি উঠে আসবো ,অভীক বললো…..তুই পড়া শেষ করেনে | তারপর আমি বাবার সাথে কথা বলবো| আমি চলে এলাম … সকালে অভীক যাবার আগে প্রতিবছরের মতো দেখা করতে এসেছিল…..অপেক্ষা করিস আমার জন্য|       তখন ফোনের চল ছিলোনা চিঠী লেখার প্রচলন ছিলো|প্রিয় মানুষের চিঠী এলে তা যত্ন করে রেখে দেওয়া হতো,বারবার করে পরা হতো| তাতে একটা আলাদা ভালোলাগা ছিলো| অভীকরা চলে গেল| মনটা ভীষন খারাপ প্রতি বছরের মতো| অপেক্ষা ,দিনগোনা শুরু|              

পরের বছর দেখা হওয়ার ইচ্ছাটা বেশ প্রবল| না জানি এ বছর দেখা হলে দি বলবে সে| পরের বছর পূজো এলো| সবাই এলো ধিরে ধিরে কিন্তু অভীকরা এলো না আমেদাবাদ থেকে| চৌধুরী বাড়ির কেয়ারটেকার রতন কাকুকে ইতিমধ্যে অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছি কিন্তু কোন খবর সে দিতে পারেনি| দূরে ট্রেনের আওয়াজ শুনে অনেকবার ষ্টেশনে ছুটে গেছি | কিন্তু অপেক্ষা অপেক্ষা হয়েই থেকে গেছে| নবমী পূজোর দিন রতনকাকু জানালো ওবাড়িতে কথা হচ্ছে সামনের বৈশাখে অভীক দাদাবাবুর বিয়ে| মেয়ে দাদাবাবুর পছন্দের | তাই এবছর তারা আসেননি| সামনের বার নতুন বৌ নিয়ে আসবে|           

অপেক্ষার শেষে – ভালোবাসার গল্প – Bangla Love Story

কথাগুলো বলে রতন কাকু চলে গেলো| কিন্তু আমি সেখানেই দাড়িয়ে রইলাম| নিজের কানকে আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না| মনের ভেতরটা দুমরে মুচরে শেষ হয়ে যাচ্ছিল| মনকে শক্ত করলাম | বোঝালামও অনেক, বড়োলোক বাড়ির ছেলের পাশে আমাকে মানাায় না| তাকে দয়া করা যায় ভালোবাসা যায় না| পূজো শেষে পড়াশোনায় মন দিলাম| নিজের পায়ে দাড়ানোর একটা জেদ চেপে বসলো আমার মাথায়| এমন সময় বাবার শরীর খুব খারাপ হয়ে গেল| গ্রামে ভালো ডাক্তার নেই শহরে নিয়ে গেলাম বাবাকে| ডাক্তার সব পরীক্ষা করে জানালেন বাবার ক্যান্সার| খুব বেশি ছয় মাস| আমি ঠিক করে নিলাম গ্রামের জমি,বাড়ী বিক্রি করে শহরে চলে আসবো|        

কিছুদিনের মধ্যেই জমি,বাড়ি বিক্রি করে একটি শহরে চলে এলাম| এখানে একটি ছোট মাথার ছাদ কিনে বাপ মেয়েতে থাকতে শুরু করি| বাবার চিকিৎসা চলতে থাকে|কিন্তু বাবাকে আর বেশি দিন ধরে রাখতে পারলাম না| সেও আমাকে ছেড়ে চলে গেল| বড়ো একা হয়ে পরলাম| পড়া শেষ করে একটি স্কুলের চাকরি জোগাড় করেছি| গ্রাম ছেড়ে আসার আগে রতন কাকুর থেকে জানতে পেরেছিলাম অভীকের বিয়ে হয়ে গেছে,ওরা ভালো আছে| পূজোতে হয়তো জোড়ায় আসবে| আমার সাথে দেখা হবার কনো সম্ভাবনাই নেই | শহরের এ ঠিকানর কথা কেউ জানে না| কারো জানার প্রয়োজন ও নেই|সাত বছর এক প্রকার লুকিয়েই আছি বলা যায়| নিজের কাছেই নিজে লুকিয়ে আছি|            এক সময় পূজোর দিনগুলো আনন্দের হলেও  এখন খুব কষ্টের| এই দিনগুলো ঘর অন্ধকার করে কানে তুলো দিয়ে বসে থাকি| কতো চেষ্টা করি তবু স্মৃতিগলো চারিদিকে ভেসে বেড়ায়| কিন্তু আজকের এই চিঠিটা বড্ড ভাবাচ্ছে|লেখা আছে….

হার্ট টাচিং লাভ স্টোরি

   অনেকগুলো দিন কেটে গেছে মাঝখানে| আমি জানি তুমি আজও আমার অপেক্ষায় আছো| এতো অভিমান আমার ওপর| আমি এখন সোনাপুরে আছি| অনেক কথা বলার আছে| আমি রোজ তোমার জন্য অপেক্ষা করবো পুরনো বটগাছের তলায় ,দেখবো কতো দিন তুমি না এসে থাকতে পারো|                                                       ইতি            তোমার অভীক
              অভীকের বিয়ে হয়ে গেছে তারপরেও এমন চিঠি | তবে কি চরিত্র খারাপ হয়ে গেছে? বৌ থাকতেও তোমার অভীক লিখছে| না কি অন্যকেউ মজা করছে|    

 না গেলে জানাও যাবে না সত্যিটা কি| তাই যেতে যখন হবে আর দেরি করে কি হবে| কাল সকালেই রওনা দেব সোনাপুর|সকালে এসে পৌছালাম| সব চেনা মানুষেরা এগিয়ে এলো কথা বলতে| কিছুটা এগোতেই বাবার স্কুল, তার পরেই আমাদের সেই বাড়ি| বাড়িতে মনে হয় কোন অনুষ্ঠান আছে আজ| পুরো বাড়ি সুন্দর করে সাজানো| পাশদিয়ে চলে গেলাম|দীপাদের বাড়িতে থাকবো আজ| এমনটাই ঠিক করে রেখেছি|কাকিমা আমাকে খুব ভালোবাসে| সেখানে গিয়ে কাকিমার সাথে অনেক গল্প করলাম ,দীপা শ্বশুর বাড়িতে|বিকেল হতে বটগাছটার নিচে গেলাম| একা কিছুক্ষন দাড়িয়ে আছি| কেউ কোথাও নেই| মনে হলো তবে কি কেউ আমার সাথে ইয়ারকি করলো?কি বোকা না আমি|

অপেক্ষার শেষে – ভালোবাসার গল্প – Bangla Love Story

এ সব ভেবে ফিরবো বলে পা বাড়িয়েছি হঠাৎ…..~একই রকম আছিস তুই| দূর থেকে দেকছিলাম| কাছে এলে তো ভালো করে দেখতেও দিবি না|~কেন আসতে বলেছো| কি বলার আছে তোমার| নিজের বৌ থাকতে এ সব কথা বলছো আমাকে লজ্জা করে না| নিজেকে আর কতো নিচে নামাবে|~ বৌয়ের সাথে দেখা করবো তাতে লজ্জা কি|~এ সব কথা ছারো কি জন্য আসতে বলেছো বলো|~আর কতো দিন অপেক্ষা করবি| অনেক হলো| এবার তোকে বিয়ে করে ঘরে নিয়ে যাব|

~ তুমি কি বলছো এসব|তুমি কি ভাবছো আমি কিছু জানি না|রতন কাকু আমাকে সব বলেছে| সাত বছর আগে তোমার বিয়ে হয়ে গেছে|~ না, হয়নি| বাবাকে আমি তোর নিয়ে সব জানাই |তার ইচ্ছা ছিলো না এ বিয়েতে| তোর থেকে আমাকে দূরে করার জন্য রতন কাকুকে দিয়ে এ কথা গুলো তোকে বলিয়েছে| তুই যাতে আমাকে ভুল বুঝে ছেড়ে দিস| বিশ্বাস না হলে রতন কাকুকে জিজ্ঞাসা কর | আমি নিয়ে এসেছি| ঐ যে দাড়িয়ে আছে| চাকরি চলে যাবার ভয়ে মিথ্যা বলতে বাধ্য হয়েছে|   

এতোগুলো বছর ধরে তোকে পাগলের মতো খুঁজেছি| প্রতিটা পূজো অপেক্ষা করে থেকেছি সোনাপুরে হয়তো আসবি| কিন্তু…..~তাহলে সে বার পূজোতে আসনি কেন| তুমি জানতে না আমি অপেক্ষা করবো|~ সেবার পূজোতে মায়ের ভীষন জ্বর| তাই আমাদের আসা হয়নি|


ভালোবাসার লাভ স্টোরি     

         চল চৌধুরী বাড়িতে তোর জন্য মা অপেক্ষা করছে| চৌধুরী বাড়ি গেলাম | কাকীমা বলে ডাকতেই …আমাকে বললো….না এখন থেকে মা বলতে হবে যে|নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারলাম না| এতো ভালো দিনও যে আমার ভাগ্যে লেখা ছিল বিশ্বাসই হচ্ছিল না|অভীকের বাবার এ বিয়েতে আর কোন আপত্তি নেই| ছেলের খারাপ সময়টা তিনি দেখেছেন| তাই তিনিও মত দিলেন|     সামনেই পূজো |পূজোর পরেই বিয়ে| এবার পূজোয় চৌধুরী বাড়ির ভাবী বৌ |প্রচুর দায়িত্ব| সব সামলে অভীকের সাথে মাঝে মাঝে ছোটবেলার দিনে ফিরে যাওয়া| পূজোর পরে অঘ্রায়ন মাসে বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে|     

অভীকের বাড়ি থেকে বিয়ের সব ব্যবস্হা করেছে| বিয়ে হচ্ছে আমার সেই পুরনো বাড়ীতে ,যেটা সে দিন সাজানো দেখেছিলাম| অভীক জানায় এ বাড়ী সে পরে কিনে নিয়েছিল| আমার জন্য মন খারাপ হলে এ বাড়িতে এসে থাকতো| অপেক্ষার শেষে অভীকের বুকে মাথা রেখে, সকল কষ্ট, চোখের জল হয়ে ভিজে উঠছিল দুইজনের হৃদয়|
     সমাপ্ত

Leave a Comment